Breaking News
Loading...
Sunday, July 21, 2013

বিংশ শতাব্দীর বাঙ্গালি জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম হুমায়ূন আহমেদ। ৬৪ বছরের জীবনে ৪০ বছরই তিনি সাহিত্যে বিচরণ করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় লেখক হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার ছিলেন। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি সমাদৃত।
বিশিষ্ট এ কথা সাহিত্যিকের লেখা দুইশ’র বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আর কিছু গ্রন্থ স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ফয়জুর রহমান ও মা আয়েশা আখতার খাতুন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবার বড়। বাবার চাকরির সুবাদে লেখকের জীবনের একটি বড় অংশ দেশের নানা জায়গায় কেটেছে।
হুমায়ূন আহমেদের পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় তিনি শহীদ হন।

ছোটকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল ছিল শামসুর রহমান ও ডাকনাম কাজল। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পিতা ফয়জুর রহমান ছেলের নাম শামসুর রহমান রাখেন। পরবর্তীতে ফয়জুর রহমান নিজেই নাম পরিবর্তন করে হুমায়ূন আহমেদ রাখেন।
হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। ১৯৭৩ সালে তাদের বিয়ে হয়। এই দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। তাদের এক ছেলে অকালে মারা যায়। এরপর ২০০৫ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয় এবং ওই বছরই অভিনেতা শাওনকে বিয়ে করেন তিনি। এ ঘরে তাদের তিন ছেলে-মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রথম ভূমিষ্ঠ কন্যাটি মারা যায়।
সত্তরের দশকে ছাত্র বয়সেই হুমায়ূন আহমেদ লেখালেখির শুরু করেন। প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে সাহিত্যের জগতে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রথম লেখাতেই জয় করে নেয় পাঠকের মন। একইসঙ্গে সমালোচকদেরও নজর কাড়েন। এরপর আমৃত্যু লিখে গেছেন তিনি।

শঙ্খনীল কারাগার, এইসব দিনরাত্রি, সৌরভ, অপেক্ষা, কবি, নীল অপরাজিতা, সবাই গেছে বনে, তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে এবং জনম জনমসহ তার সব রচনার সহজ-সরল কথকতা ও অনুভূতি পাঠক হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

জনপ্রিয় এ কথা সাহিত্যিকের কারণে বিশাল এক পাঠক সমাজ তৈরি হয়। মূলত তার রচিত বই কিনতেই সব বয়সের পাঠক বইমেলায় জড়ো হতেন। আনন্দ-বেদনা ও প্রেম-বিরহসহ সব ধরনের অনুভূতিই তার লেখায় ফুটে উঠেছে।

হুমায়ূন আহমেদের লেখায় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গও বারবার ফুটে উঠেছে। জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প, ১৯৭১, সূর্যের দিন এবং শ্যামল ছায়ার মতো রচনাগুলো মানুষকে একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। ১৯৮১ সালে বরেণ্য এ সাহিত্যিক বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার পান।

বিটিভিতে প্রথম ধারাবাহিক নাটক এইসব দিনরাত্রির মধ্য দিয়ে নাট্যকার হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের পথচলা শুরু হয়। এরপর বহুব্রিহী, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই–এ ধারাবাহিকগুলো তাকে অসামান্য খ্যাতি এনে দেয়।

হুমায়ূন আহমেদের তৈরি অন্যতম চরিত্র হচ্ছে ‘বাকের ভাই’। মিসির আলী ও হিমুর মতো চরিত্র সৃষ্টি করেও তিনি পাঠককে মাতিয়েছেন। তার সৃষ্ট চরিত্র শুভ্র’র প্রেমে পড়েছে কোটি তরণী।

৯০-এর দশকে হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ণ বিভাগের অধ্যাপনা পেশা ছেড়ে পুরোপুরিভাবে সৃজনশীল কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমনি’ দ্বারা তিনি জিতে নেন একুশে পদকসহ ৮টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার। তারপর একে একে নির্মাণ করেন শ্রাবণ মেঘের দিন, শ্যামল ছায়া, দুই দুয়ারি এবং আমার আছে জলসহ ১৩টি চলচ্চিত্র। তার পরিচালিত চলচ্চিত্র দ্বারা বহুবছর পর মধ্যবিত্ত মানুষ হলমুখী হন।
বরেণ্য এ লেখক দীর্ঘ ১০ মাস ক্যান্সার নামের মরণব্যাধির সঙ্গে লড়েন। চিকিৎসার জন্য ২০১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবার নিউইয়র্ক যান। সেখানে ১২ দফা কেমো থেরাপি নেয়ার পর ওই বছরের ১১ মে ২০ দিনের জন্য দেশে ফিরে আবার চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কে যান।

এরপর ২০১২ সালের ১২ জুন নিউইয়র্কের ম্যানহাটন বেলভিউ হাসপাতালে তার প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। আর ২১ জুন ওই হাসপাতালেই দ্বিতীয়বারের মতো তার অস্ত্রোপচার করা হয়।

পরে অবস্থার অবনতি হলে হুমায়ূন আহমেদকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে নিবিড় পরিচর্যায় চিকিৎসকরা বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা চালান। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে লাখো ভক্তকে কাঁদিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এই বিশিষ্ট লেখক।
২০১২ সালের ১৯ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২০ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ম্যানহাটন বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন আহমেদ। ওই সময় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, ছোটভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং বন্ধু মাজহারুল ইসলামসহ আরো স্বজনরা তার পাশে ছিলেন।

মৃত্যুকালে এ নাট্যনির্মাতার বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর।

তবে লেখনির অসামান্য বৈচিত্র ও তিন দশকের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা দেশবরেণ্য লেখক, জননন্দিত ঔপন্যাসিক এবং চলচ্চিত্র ও নাট্যনির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকে আজীবন বাঁচিয়ে রাখবে।

0 comments:

Post a Comment