Breaking News
Loading...
Saturday, January 16, 2010

টপ্পা গানের নিধুবাবু কবি নিধু বাবুর ভাল নাম রামনিধি গুপ্ত | ১৭৪৮-৪১ সালে বাংলায় বর্গীর হাঙ্গামার সময়, পিতা হরিনারায়ণ গুপ্ত, যিনি কলকাতার কুমারটুলি অঞ্চলে চিকিত্সক ছিলেন, চলে যান ত্রিবেণীর কাছে চাপতা গ্রামে, যেখানে তাঁর শ্যালক রামজয় কবিরাজ থাকতেন | সেখানেই কবির জন্ম হয় | তাঁর শিক্ষা কলকাতাতেই সম্পন্ন হয় | অনুমান ২০ বছর বয়সে নিধু বাবু বিহারের ছাপরা জেলায় রাজস্য বিভাগের "দ্বিতীয় কেরাণীর" চাকরি নিয়ে চলে যান | তখন ছাপরার কালেক্টার ছিলেন মন্টগোমারি সাহেব | প্রায় ১৮ বছর চাকরি করার পর তিনি কাজে ইস্তফা দিয়ে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন এবং সংগীত সৃষ্টিতে মেতে থাকেন | তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে অনেক তথ্যই আমাদের সঠিক জানা নেই, তাই নানা কিংবদন্তীর সূত্রপাত | অষ্টাদশ শতকের ষাটের দশক ছিলা বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় | একবার নবাব মিরকাশিম ও পাটনার জনৈক কুঠিয়াল ইংরেজ এলিস সাহেবের দ্বন্দ্ব হয় | গোলাম হোসেন রচিত "সেইর-উল-মুতাক্খরিণ" গ্রন্থে লেখা আছে যে ঐ দ্বন্দ্বের সময় সারণের ফৌজদার এক বাঙালী রামনিধি, এলিস সাহেব এর অসুবিধার সৃষ্টি করে |
প্রথমে নিধু বাবু ছাপরার এক মুসলমান ওস্তাদের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখেছিলেন | পরে ছাপরা জেলার রতনপুরা গ্রামের ভিখন রামস্বামীর মন্ত্র শিষ্য হন | তিনি নানা রকমের গান লিখে ছিলেন কিন্তু তাঁর টপ্পা গানের জন্যই মূলত তাঁর খ্যাতি | উনিশ শতকের শেষ অবধি তাঁর টপ্পাগুলি খুব জনপ্রিয় ছিল | তাঁর গান বাইজিদের মজলিশ বা ঐ জাতীয় অনুষ্ঠানে বেশী গাওয়া হত বলে পরে অনেকে তা সাহিত্যরসহীন আখ্যা দিলেও এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে তাঁর কবিতা আধুনিক এবং অতি উচ্চমানের | নিধু বাবুর টপ্পাকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করা অন্যায় |
মুর্শিদাবাদের নিজামাতের দেওয়ান রাজা মহানন্দ রায় কলতকাতায় এলে কবির সাথে আমোদ প্রমোদ করতেন | রাজার রক্ষিতা শ্রীমতীর সাথে নিধুবাবুর মধুর সম্পর্ক ছিল| কবি শ্রীমতীর কাছে যাতায়াতের সময়ে নানা প্রেমগীত রচনা করেছিলেন | তাঁর ব্যক্তিগত জীবন অতি ভদ্র, মার্জিত ও রুচিশীল ছিল | বাংলা টপ্পা গানের জনক রামনিধি গুপ্ত ১৮০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আখড়াই দল। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত এই দলে তার নিজস্ব গায়কী রীতি তিনি প্রচলন করেন। ধীরে ধীরে তার গায়কী রীতি এবং সৃজিত গীতাবলি ওই সময় যথেষ্ট সমাদৃত হয়। নিধুবাবু তার সময়ে হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় শিল্পী। তিনি বিশ্বাস করতেন রসসৃষ্টি ব্যতীত সঙ্গীতের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই এবং সঙ্গীত চর্চা সবার কাজ নয়। সঙ্গীতের স্রষ্টা বিশেষজনেরা এবং ভক্ত কেবল ধনী ও গুণীরা। বার্ধক্যজনিত কারণে ১৮৩২ সালে তিনি আখড়াই দলের অধ্যক্ষ পদ পরিত্যাগ করেন এবং তার প্রিয় সুযোগ্য শিষ্য মোহনচাঁদ বসুকে অধ্যক্ষ নিয়োগ করেন। গুরুভক্ত ও দৃঢ়চেতা মোহনচাঁদ বসু অধ্যক্ষ পদ লাভের পর নিজস্ব মত ও রীতি প্রচলন করেন। মোহনচাঁদ বিশ্বাস করতেন মানুষের জন্য সঙ্গীত। তিনি বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, নাথগীতিকা প্রভৃতি নাট্যগুণসমৃদ্ধ বাংলা কাব্যকে উপস্থাপন করেন নিজস্ব রীতিতে। তার পরিবেশনায় এসব কাব্য নাট্যক্রিয়া হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। রামনিধি গুপ্ত পরিবেশন রীতির এই পরিবর্তন গ্রহণ করতে পারেননি বলে দলে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। মোহনচাঁদ বসু দল থেকে চলে গিয়ে গঠন করেন ‘হাফ আখড়াই’ দল। দল গঠনের মাত্র এক বছরের মধ্যে তারা কলকাতায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

নিধুবাবুর কয়েকটি টপ্পা গান
১। নানান্ দেশে নানান্ ভাসা
২। পিরীতি না জানে সখী
৩। আসিবে হে প্রাণ কেমনে এখানে
৪। সখি ! কোথায় পাব তারে, যারে প্রাণ সঁপিলেম
৫। যাও ! তারে কহিও, সখি, আমারে কি ভুলিলে
৬। আমি আর পারি না সাধিতে এমন করিয়ে
৭। ভ্রমরারে ! কি মনে করি আইলে প্রাণ নলিনী ভবনে
৮। শুন, শুন, শুনলো প্রাণ ! কেন তুমি হও কাতর
৯। ঋতুরাজ ! নাহি লাজ, একি রাজনীত
১০। কি চিত্র বিচিত্র কুসুম ঋতুর চরিত্র গুণ
১১। মধুর বসন্ত ঋতু ! হে কান্ত ! যাবে কেমনে
১২। এ কি তোমার মানের সময় ? সমুখে বসন্ত
১৩। শৈলেন্দ্রতনয়া শিবে, সদাশিবে প্রদাভবে
১৪। অপার মহিমা তব, উপমা কেমনে দিব
১৫। শঙ্করি শৈলেন্দ্র সুতে, শশাঙ্ক শিখরাশ্চিতে

নিধুবাবুর ২টি টপ্পা

|| কামোদ খাম্বাজ || জলদ তেতালা ||

নানান্ দেশে নানান্ ভাসা (ভাষা)
বিনে স্বদেশীয় ভাসে পূরে কি আশা ?
কত নদী সরোবর,
কি বা ফল চাতকীর |
ধরাজল বিনে কভু ঘুচে কি ত্রিষা (তৃষা) ?

|| ঝিঁঝিট || জলদ তেতালা ||

পিরীতি না জানে সখী (সখি), সে জন সুখী বল কেমনে ?
যেমন তিমিরালয় দেখ দীপ বিহনে ||
প্রেমরস সুধাপান, নাহি করিল যে জন,
বৃথায় তার জীবন, পশু সম গণনে || ১ ||

0 comments:

Post a Comment