Breaking News
Loading...
Wednesday, June 2, 2010

আধুনিক গল্পকার বরেণ্য সাহিত্যিকে ফ্রাঞ্জ কাফকার জন্ম হয় ১৮৮৩ সালের ৩ জুলাই বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগ শহরে একটি মধ্যবিত্ত জার্মানভাষী ইহুদি পরিবারে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফ্রাঞ্জের বেড়ে ওঠাও এই প্রাগ শহরে। আর এই প্রাগ শহরই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল কাফকার মননে, অনুভবে এবং লেখাতে। তাই একটি ইনসুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করলেও ফ্রান্‌ৎস কাফকার চোখে যেন সর্বদাই ভেসে উঠত প্রাগের সৌন্দয- শীতের সকালে বরফে ঢাকা সাদা ক্যাথিড্রালের চূড়া অথবা রাতের নিস্তব্ধতা। ফ্রান্‌ত্স কাফকার জীবনীকার রাইনার স্টাখের ভাষায় যে বিষয়গুলো ছিল অনেকটাই মস্তিষ্কে ক্রমাগত চলতে থাকা এক চলমান ছায়াছবির মতো।
প্রাগের স্কুল এবং কলেজে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করে কাফকা ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব প্রাগে। একটু বেশি সময় নিয়ে পড়া যায় বলেই এখানে এসে আইন অনুষদে ভর্তি হয়েছিলেন কাফকা। আর ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে চলছিল তার প্রিয় জার্মান ভাষা আর শিল্প ইতিহাসংক্রান্ত পড়াশোনাগুলোও। মূলত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়েই এখানকার শিক্ষর্থীদের পরিচালিত একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক ক্লাবের সাথে জড়িয়ে পড়েন কাফকা। নিজের মতো করে টুকটাক লেখালেখিও চালিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে ১৯০৬ সালে আইন বিষয়ক পড়াশোনা শেষ করে এক বছরের প্র্যাকটিস শেষে কাফকা যোগ দেন একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে। কিন্তু ইন্সুরেন্স কোম্পানির সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত অফিস শিডিউলে লেখালেখি করার পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যেত না বলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হাঁপিয়ে উঠেছিলেন কাফকা। এ কারণে চাকরি পরিবর্তন করে শ্রমিকদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে যোগ দেন তিনি। আর এখানে কাজ করতে যেয়েই সমাজের নানা শ্রেণীর মানুষকে আরো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান কাফকা। চলতে থাকে তার সাহিত্যচর্চা। আর কাজ ও লেখালেখির বাইরে কাফকার হরিহর আত্মা দুই বন্ধু ম্যাক্স ব্রড এবং ফেলিক্সকে নিয়ে গড়ে উঠতে থাকে সাহিত্যের এক অনন্য ত্রয়ী। যদিও দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে কাফকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার লেখা নিয়ে সমকালীন সাহিত্যিকদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল খুব সামান্যই। এমনকি হাতে গোনা যেসব লেখা কাফকার মৃত্যুর আগে প্রকাশিত হয় সেসব লেখা দিয়ে সেই সময়কার পাঠক বা বোদ্ধাদের নজরও কাড়তে পারেননি কাফকা। এছাড়া এ সময় হাতে গোনা কিছু ছোটগল্প আর আলোচিত উপন্যাস ‘মেটামরফসিস’ ছাড়া কাফকার অন্য কোনো লেখা তিনি প্রকাশও করেননি। বরং নিজের একান্ত বোধের জায়গায় দাঁড়িয়ে লেখা কাফকার এই লেখাগুলো বহুদিন ধরেই বন্দি হয়েছিল তার লেখা ২০টিরও বেশি ডায়েরি আর অসংখ্য চিঠিপত্রে। মজার বিষয় হলো বন্ধু ম্যাক্স ব্রড-এর পাশাপাশি প্রেয়সী ডোরাকেও কাফকা মৃত্যুর আগে তার লেখাগুলো ধ্বংস করতে বলে গিয়েছিলেন। তবে ম্যাক্স ব্রড এবং ডোরা কেউই কাফকার এই অনুরোধ রাখেননি। আর তাদের কল্যাণেই কাফকার মৃত্যুর পর একে একে আলোর মুখ দেখতে থাকে জীবদ্দশায় লিখে যাওয়া কাফকার অমূল্য সব রচনাসম্ভার। এমনকি জীবদ্দশায় যে কাফকা ছিলেন অজনপ্রিয় আর তুলনামূলক অপরিচিত এক লেখক সেই কাফকাই তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত এই লেখাগুলো দিয়ে রাতারাতি হৈচৈ ফেলে দেন। যদিও এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকেই দৃঢ়ভাবে দাবি করেন যে কাফকা তার সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে বড় নিদর্শনগুলো অপ্রকাশিত রেখে যাওয়াতেই জীবদ্দশায় তাকে নিয়ে অতটা আলোচনা তৈরি হয়নি। আসলে জীবন কিংবা কর্মের কোনো মাধ্যমেই অমরত্ব চাননি কাফকা। এ কারণে একমাত্র লেখালেখি ছাড়া আর কোনো কাজেই নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে পেতেন না তিনি। আবার এই লেখাকে জীবিকা করা যায়নি বলে বাস্তবতার টানে তাকে যে চাকরি করতে হয়েছে সেটাও মানসিকভাবে ভীষণ ভুগিয়েছে কাফকাকে। আর কাফকার এই আত্মদহনের স্বীকারোক্তি খুঁজে পাওয়া যায় তার রেখে যাওয়া ডায়েরির পাতাতেও। কাফকা লিখেছেন, ‘আমি একটি সামাজিক নিরাপত্তা অফিসে কর্মরত আছি। এখন এই দুটি বৃত্তিকে কখনই মেলানো যায় না, আবার সমান গুরুত্ব দেওয়াও মুশকিল। একটি ক্ষেত্রে সামান্য আনন্দ অন্যটিতে বিপর্যয় ডেকে আনে । কোনো সন্ধ্যায় ভালো লিখতে পারলে পরের দিন অফিসে আমার মাথায় আগুন ধরে যায়। কিছুই ঠিকমতো করতে পারি না। অফিসে আমি বাহ্যিক বাধ্যবাধকতা পালন করি, কিন্তু আন্তরিক অনুশাসন নয় এবং প্রতিটি অপূর্ণ আন্তরিক আকাঙক্ষাই চরম দুর্দশার উৎস হয়ে ওঠে। আর এই দুর্দশার দুঃখ সামলাতে হিমশিম যুবক কাফকা তাই অজান্তেই চলে যাচ্ছিলেন মানসিক স্বেচ্ছানির্বাসনে এবং এর প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায় কাফকা-সৃষ্ট চরিত্রগুলোর সম্পূর্ণ সমাজবিমুখতা ও বিচ্ছিন্নতার মাঝে। নানা সময়ে রচিত কাফকার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে ছোটগল্প- ডেসক্রিপশন অব এ স্ট্রাগল, কনটেম্পটেশন, দ্য জাজমেন্ট, ইন দ্য পেনাল কলোনি, দ্য ওয়ার্ডেন অব দ্য টম্ব, দ্য রিফিউজাল, এ হাঙ্গার আর্টিস্ট, এ লিটল ওম্যান, ফার্স্ট সরো, দ্য বারো। উপন্যাস- দ্য ট্রায়াল, দ্য ক্যাসেল, আমেরিকা প্রভৃতি। এছাড়া কাফকার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া ডায়েরি এবং চিঠি নিয়ে বেশ কয়েকটি সংকলনও প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে যক্ষ্মায় ভুগে অবশেষে ১৯২৪ সালের ৩ জুন মাত্র ৪০ বছর বয়সে মারা যান বিংশ শতকের অন্যতম সেরা এই সাহিত্যিক।

0 comments:

Post a Comment